স্বাধীনতার পর যখন ব্রিটিশ বাংলা প্রদেশ দ্বিধাবিভক্ত হয়, তখন তার পূর্বার্ধের নাম হয় ‘পূর্ব বাংলা’ ও পশ্চিমার্ধের নাম হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ’। ১৯৫৬ সাল নাগাদ পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় পূর্ব পাকিস্তান। তারপর ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান হয় বাংলাদেশ। এইভাবে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায় ইতিহাসের পূর্ববঙ্গ। কিন্তু পূর্ব না থাকলেও, পশ্চিমটি কিন্তু ঠিকই থেকে যায় আমাদের রাজ্যের নামের আগে।
১৯৯৯ সালে জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রিত্বকালের একেবারে শেষপর্বে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে পশ্চিম ছেঁটে ফেলার চিন্তাভাবনা শুরু হয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ‘ক্যালকাটা’-কে ‘কলকাতা’ আর ‘পশ্চিমবঙ্গ’কে ‘বাংলা’ করার উদ্যোগ নেন। ‘ক্যালকাটা’ ‘কলকাতা’ হয়, কিন্তু রাজ্যের নাম পরিবর্তনের ইস্যুটি হিমঘরে চলে যায়। রসিক নিন্দুক বলে থাকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে সময় তাঁর দলের মুখপত্রের ‘জাগো বাংলা’ নামকরণ করে ‘বাংলা’ নামটির প্রতি বুদ্ধবাবুকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিলেন!
সে যাই হোক, ক্ষমতায় আসার পর মমতাদেবী আবার রাজ্যের নাম পরিবর্তনে উৎসুক হয়েছেন। জানা যাচ্ছে, চারটি নাম প্রস্তাবের মধ্যে রাখা হয়েছে ‘বঙ্গ’, ‘বঙ্গদেশ’, ‘বঙ্গপ্রদেশ’ ও ‘বঙ্গভূমি’। মুখ্যমন্ত্রী এই বিষয়ে সকলের মতামত নিয়ে এগোতে চান। রাজ্যনাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিও বেশ জটিল, সুতরাং যাই হোক না কেন, খুব শীঘ্র রাজ্যের নাম পরিবর্তিত হবে না। ইত্যবসরে, কিছু নামবিচার করা যাক।
গত ক’দিনের কাগজ পড়ে বুঝছি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের মতো হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীই নাম পরিবর্তনের পক্ষে। তাঁদের যুক্তি নানাবিধ:
১) পূর্ববঙ্গ যখন নেই, তখন পশ্চিমবঙ্গেরও থাকার কোনো যুক্তি হয় না।
২) যে ঐতিহাসিকতার কথা পশ্চিমবঙ্গ নামটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তা আরোপিত, এমন কোনো ঐতিহাসিকতা এই নামের সঙ্গে যুক্ত নয়।
৩) ইংরেজিতে West Bengal নামটি W দিয়ে শুরু হওয়ায়, বর্ণানুক্রমিক নামতালিকার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের ডাক পড়ে সবার শেষে। কিন্তু নামটি B দিয়ে শুরু হলে নামতালিকায় পশ্চিমবঙ্গের নাম থাকবে উপরের দিকে।
এই ক্ষেত্রে আমার আরও একটি বক্তব্য রয়েছে। দেশভাগের পর কোটি কোটি পূর্ববঙ্গীয় চলে আসেন পশ্চিমবঙ্গে। তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তাঁদের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ও লোকাচার। সেই সব বৈশিষ্ট্য-লোকাচারে সমৃদ্ধ হয় পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও অর্থনীতি। পশ্চিমবঙ্গ পরিণত হয় পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক মহামিলনক্ষেত্রে। এমতাবস্থায় এই রাজ্যকে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ সম্বোধন শুধু এরাজ্যের এই মিলনভূমিকে ভুলে থাকা।
এ রাজ্যের নাম কী হওয়া উচিত?
‘বঙ্গ’ নামটি প্রাচীন। এই নামের অস্তিত্ব রয়েছে ‘মহাভারত’ থেকে শুরু করে অনেক প্রাচীন গ্রন্থে। আমাদের জাতীয় সংগীতেও ‘বঙ্গ’ কথাটিই রয়েছে। পক্ষান্তরে, ‘বাংলা’ নামটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক। ‘বঙ্গাল’ থেকে পোর্তুগিজ ‘বেঙ্গালা’ ঘুরে সম্ভবত এসেছে ‘বাঙ্গালা’ বা ‘বাংলা’। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। ‘বঙ্গ’ ও ‘বাংলা’-র মধ্যে রেষারেষি থাকা স্বাভাবিক। মর্যাদায় কেউ খাটো নয়। কিন্তু ‘বাংলা’ নামের সমস্যাগুলি প্রথম থেকেই চর্চিত হয়ে আসছে:
১) ‘বাংলা’ ভাষার নাম। রাজ্যের নামও ‘বাংলা’ হলে ভাষা ও রাজ্যের নাম এক হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে লেখার সময় অসুবিধে হতে পারে।
২) ইংরেজি সংবাদপত্রে বাংলাদেশকেও ‘বাংলা’ বলে উল্লেখ করা হয়। তাই পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হলে সেটি বহির্বঙ্গের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
৩) পক্ষান্তরে, ‘বঙ্গ’ নামের ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলি নেই। পক্ষান্তরে ‘বঙ্গ’ বিশেষ্যের সঙ্গে ‘বঙ্গীয়’ বিশেষণের যুগলবন্দী সর্বাঙ্গসুন্দর হতে পারে। চাইলে নামের সঙ্গে ‘দেশ’ বা ‘ভূমি’ জুড়ে দেওয়া যায়।
তবে, ‘প্রদেশ’ না জুড়লেই ভাল হয়। ‘বঙ্গপ্রদেশ’ নামটির সঙ্গে ব্রিটিশ যুগের স্মৃতি জড়িত রয়েছে। এই ঔপনিবেশিক নামটি স্বাধীন ভারতে যথোপযুক্ত হবে না।
শেকসপিয়র বলেছিলেন, নামে কিছুই যায় আসে না। কিন্তু তাঁর জমানা গেছে। এখন ব্র্যান্ড ভ্যালুর যুগ। নামও এযুগে পণ্য হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই পাশ্চাত্য-বোঝাটি নামানো অত্যাবশ্যক। সুখের বিষয়, এই নিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য নেই। সকলেই একবাক্যে এটিকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বলেছেন। অতএব এই ‘ষেটে-যাওয়া’ বৃদ্ধ নামটিকে বাসাংসি জীর্ণানিবৎ পরিত্যাগ করে, নববঙ্গের নব নামকরণ হোক। আমরা সবাই গান গাই – ‘বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, আমার দেশ!’
0 comments